কালোজাদু-পৃষ্ঠা-৫৫+৫৬

0Shares

তখন নতুন স্থানে এসে নতুন গাছপালা, নতুন পশুপাখি দেখলো ।এই নতুন পশুপাখির তো একটা নাম দিতে হবে, নতুন গাছপালার একটা নাম দিতে হবে ।অন্য জাতি থেকে নিজেদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ভিন্ন ভাষা গড়ে তোলাও একটা কারণ হতে পারে। ফলে জন্ম হলো নতুন ভাষার । এবার গোত্রপ্রধান হয়তো চাইলেন আমরা আমাদের মূল বাসস্থান থেকে অনেক দুরে এসে যখন বসবাস করছি আমাদের সবকিছুই যেহেতু পরিবেশের সাথে আলাদা আইডেন্টিটি ও স্বতন্ত্রতা হয়ে গেছে, চলুন আমরা সবকিছুর নতুন নাম দিই । সবাই নতুন নামে সবকিছু ডাকবে ও চিনবে । দেখা গেলো গোত্রপ্রধান বা রাজার নির্দেশ মোতাবেক সবাই সেই নতুন নামে ডাকতে শুরু করলো ।রাজা হয়তো নিজের নামে বা তার অনুগত জনগোষ্ঠীর দ্বারা অধিকৃত অঞ্চলের দেওয়া নামে ভাষার নামে ভাষা প্রচলন করলেন ।যেমন ইংলিশ ভাষাভাষীদের নামে ইংল্যান্ড, বাঙালীর ভাষার নামে বাংলাদেশ, মালয় ভাষাভষী বা জাতির নামে মালয়েশিয়া ইত্যাদি । তখনতো পৃথিবী শুধুই ফাঁকা।জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে জাতিগোষ্ঠী আলাদা স্থানে বসবাস করলো, সাথে সাথে ভাষা পরিবর্তন হতে শুরু করলো । আপনি সামান্য উদাহরন হিসাবে বাংলাদেশের কথা বলি । আমাদের ভাষা বাংলা ।

         আঞ্চলিকতা ভেদে আপনি নোয়াখালি, সিলেট, বরিশাল, চট্টগামের কথাই ধরুন । দেখবেন এগুলোও বাংলা ভাষা হলেও আপনার বুঝতে কষ্ট হচ্ছে । আচ্ছা আপনাকে যদি বলি মেকুর কি আপনি বুঝবেন ? মেকুর হলো বিড়াল । যশোরে অনেক যায়গায় বিড়ালের এই নাম ছোটবেলায় শুনেছি। আবার যদি বলি হাইনসেলে আমি । এর মানে কি, এর অর্থ হলো রান্নাঘর এ আমি ।এই শব্দটা ও যশোরের অনেক গ্রামে আগের নানীদের মুখ শোনা যায় ।আচ্ছা ঘুনি কি । ঘুনি হলো বর্ষাকালে মাছ ধরার ফাঁদ বা খাঁচাবিশেষ যেটাতে মাছ বা সাপ  ঢুকতে পারে বের হতে পারেনা । আবার ঘরামীরা (গৃহ বাড়ি নির্মাণ মিস্ত্রী )ঘরের কাজে এসে বলতো জিনেরী লাগবে । জিনেরী মানে পেরেক ।তো এই শব্দগুলো ভাষাবীদ বা সুশীল সমাজের নাও জানা থাকতে পারে বা আপনারা জানতেও পারেন । তো কথা হলো যে লাউ সেই কদু ।

(৫৫)

তাহলে কেউ কি বলতে পারবেন কেন শুদ্ধ শব্দ থাকতে এই শব্দগুলোর প্রচলন ছিলো যশোরে ।এর উত্তর কিন্তু আমার জানা নেই ।আবার বর্তমানের জেনারেশন এই ভাষাগুলো ব্যবহার করছেনা ।এভাবে মূলত ভাষা সৃষ্টি ও বিলুপ্ত হয় ।আজকের কথায় ধরুন আমরা বাঙালীরা দু লাইন ইংরেজী শিখে, আমরা ক্রমশ বাংলিশ হয়ে পড়ছি ।বাংলা হারাচ্ছে তার মূল শব্দ ভান্ডার, প্রতিস্থাপিত হচ্ছে নতুন শব্দে ।পাঁচশো বছর আগের বাংলার সাথে এখনকার বাংলার মিল খুব কম । ধরুন আগের সাহিত্যে একটা বাক্য ছিল দোস্ত একটা বিষয় নিয় দ্বন্দে আছি । এখন সেটা বলছি কনফিউশনে আছি । তারপর ফেসবুকে আমরা লল(বোকা বা ব্যাঙ্গার্থে) , ব্রো (brother) এই জাতীয় শব্দতো  তৈরি করেই ফেলেছি ।শুধী দর্শক শ্রোতা না বলে হাই ভিউয়ার্স বলছি।আর ক্লাসে অ্যাসাইইনমেন্ট, হোমওয়ার্ক, ক্যারিয়ার এগুলোতো পার্মানেন্ট হয়ে গেছে ।এভাবে ভাষা তৈরি হয় নষ্ট হয়, বদলায়, প্রয়োজন ফুরালে বিলুপ্ত হয় । চাক, কোডা, আসোচীন, পাংখুয়া, মেগম ভাষার মত কয়েকটি বিলুপ্তপ্রায় ভাষাতাত্বিক নৃগোষ্ঠী রয়েছে বাংলাদেশে । যে ভাষায় কথা বলে মাত্র দুই হাজারের ও কম লোক ।এবং এই ভাষাভাষীদের ছেলেমেয়েরা জীবিকার ও জীবনযাত্রার  প্রয়োজনে বাংলা ভাষাতে অভ্যস্ত হচ্ছে । একদিন তাদের সে ভাষা বিলুপ্ত ও হবে কালের গর্ভে  ।

         যেমন বাইবেল বা তৌরাত এর ভাষা ছিল হিব্রু বা ইবরানী ভাষা যা খিস্ট্রীয় ৪০০ সালে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় । তবে দুটি পবিত্র গ্রন্থের ভাষা ছিলো বলে ১৮৮১ সালে এলিজিয়ের বেন এহুদা নামক এক রুশ বংশোদ্ভুত ইহুদীর হাতে এ ভাষার পূনর্জন্ম হয় ।যেটা এখন ঈসরাইলের ২য় ভাষা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে । তবে এটা মডার্ন হিব্রু নামে অভিহিত, প্রাচীন হিব্রুর সাথে পার্থক্য আছে বলে গবেষকদের অভিমত ।কেন বিতর্ক আছে জানেন কারন এলিজিয়েরের আবিষ্কারের ০৫ থেকে ০৬ দশক পরে ১৯৪৭ সালে  ডেড সী এর পশ্চিম তীরে কুমরান গুহাতে প্রাচীন হিব্রু ভাষাতে লেখা পান্ডুলিপি পায় দু জন বেদুইন বালক ।পরে যেটা গবেষকদের হাতে আসে।এ গুলোর বয়স প্রায় ২০০০ বছরের কাছাকাছি ছিলো এবং এই স্ক্রোলের ৪০% লেখার এখনো পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি ।এগুলোকে বলা  হয় ডেডসী স্ক্রল ।

(৫৬)

পরবর্তী পৃষ্ঠা দেখুন

0Shares

Facebook Comments

error: Content is protected !!