কালোজাদু-পৃষ্ঠা-৮৭+৮৮ | MEHBUB.NET

কালোজাদু-পৃষ্ঠা-৮৭+৮৮

এখন আর গায়ে শক্তি পাইনা । বুঝলে বাপু বয়সই সবকিছু । এই দেখ আমার সামনের উপরের পাটির দাঁত দুটো নেই । কেন নেই জানো, যুবক বয়সে মানুষ অনেক কিছু করে, ভবিষ্যতে ভাল না মন্দ না ভেবেই করে । আমাকে মুরব্বিরা মানা করত বাঁশি বাজাস না, আমি ছিলাম বাশির প্রচন্ড ভক্ত ।সময় পেলেই বাঁশি বাজাতাম ।ভর রৌদ্রতপ্ত দুপুরে গরু চরাতে গিয়ে ও বাঁশি বাজাতাম । আর রাতে একা বসে ফাঁকা মাঠে বাঁশি বাজানোর অভ্যাস তো ছিলই ।আহ কি সুন্দর পূর্ণিমার ভরা চাঁদ এর জ্যোৎস্না রাত।(দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা মাঠের ঝিরি বাতাস আর সাথে সুর তরঙ্গের বাশরীর সুর। ব্যাপারটা আমার কল্পনায় মাত্রাতিরিক্ত রোমান্টিক হয়ে ধরা দিলো) আমার বাবা আবার আমার এই অভ্যাসটার ঘোর বিরোধী ছিলেন । মোটেই দেখতে পারতেননা । কানের উপর চটকানা বসিয়ে দিতেন । তো বাবার থেকে সাবধান থাকতাম । একদিন হল কি বিকালের দিকে বাঁশি বাজাতে বাজাতে এমন মগ্ন হয়ে গেছি যে মাগরিবের আযান এ সম্বিৎ ফিরে পেলাম । গরু নিয়ে ফিরতে হবে । কিন্তু দুটো গরু দেখলাম না । বাকি গরু গুলো পেলাম । এখন হলো কি আমি ভেবেছিলাম ওই দুটো গরু বাড়িতে ফিরে গেছে । বাড়িতে যেইনা ঢুকেছি তখনি দেখি বাবা বেশ ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে হারিকেনের কাঁচ মুচছেন আর  বলছেন, বলি নবাবের ব্যাটা আর দুটো গরু কি আমি নিয়ে আসব । সারাদিন শুধু ওই বাঁশির ঘোড়ার ডিম নিয়ে পড়ে থাক । গরু নিয়ে না এলে এ বাড়ির ভাত তোর জন্য চিরকালের জন্য বন্ধ ।বাড়ি থেকে বের হq, এই বলে বাবা রাগে আমার দিকে কাগ (আঞ্চলিক ভাসাতে লম্ফতে(সলতে দিয়ে কুপি বাতি)কেরসিন ঢালার জন্য এক ধরনের চোঙ ব্যবহার করা হত ) আমার দিকে ছুড়ে দিলেন। আমি আব্বার মেজাজ খারাপ দেখে বাড়ির বাইরে চলে গেলাম ।ভাবলাম এ আর বিশেষ কি, তাড়াতাড়ি গরু খুজে নিয়ে বাড়ি ফিরব, যাবে আর কোথায় । গ্রামের কারো বাড়ি বা ঘরের পিছনে হয়ত কলা গাছ খাচ্ছে । এই ভেবে বেরিয়ে পড়লাম । কোথায় কি, সারা গ্রাম খুজে কোথাও গরু দুটোর দেখা পেলাম না । বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে । আমার গ্রাম আড়পাড়া এর শেষ সীমানা বালিয়াডাঙ্গা ।তারপর মাঠ টা পেরোলে পরে পাঁচবাড়িয়া গ্রাম ।

(৮৭)

পাঁচবাড়ীয়া গ্রাম এ চলে গেলো নাকি !। মনে সন্দেহটা ঢুকতেই হাটা শুরু করলাম পাঁচবাড়িয়ার উদ্দ্যেশে ।সেখানে গরু কি থাকবে, এই রাত কি গরু ওখানে যাবে । বেশ ০২ কিলোমিটার এর মত ফাঁকা মাঠ । শীতের রাত, আকাশে ভরা জ্যোৎস্না ।মাঠের ভিতর দিয়ে হেটে যাচ্ছি ।কোথাও গরু দেখলাম না ।মাঠ পেরিয়ে পাঁচবাড়ীয়া গ্রামের সীমানাতে ঢুকে পড়েছি । মনুষ্য বসতি কয়েকঘর মাত্র এ পাশে, আমি যে পাশে মাঠের ভিতর দিয়ে উঠেছি, বেশ ভাল মত ঝোপঝাড় জঙ্গল আছে, এমন সময় আমার খেয়াল হলো খাওয়া হয়নি, পানির পিপাসা তা অবশ্য শীতে লাগেনি ।খিদে ও তেমন লাগেনি, তবে খেতে পারলে ভাল হত । এমন সাত পাচ ভাবতে ভাবতে দেখি আমি এমন একটা যায়গাতে দাড়িয়ে যে যায়গাটা নদীর পাড়ে ।ঘটনা অন্তত ৪০ বছর আগের ।বেশ কয়েকশ গজ দূরে বৈদ্যনাথের মন্দির আছে ।এই মন্দিরে বাবা বৈদ্যনাথের একটা বিগ্রহ পাথর সংরক্ষিত আছে, যেটা নাকি পাশের এই বুড়িভৈরব নদীতে ভেসে এসেছিল। উপরে জ্যোৎস্না, কুয়াশার ভাব এ আমার আবার মাথাতে পাগলামি ঢুকে গেল । সেই বাঁশির পাগলামি । বাঁশিটা যে লুঙ্গির সাথে কোমরে আছে এতক্ষন খেয়াল করিনি ।এতক্ষনে খেয়াল হলো  কনকনে শীতে চাদরটা গায়ে ভালভাবে পেচিয়ে নিয়ে নদীর পাশে পরিস্কার যায়গা দেখে শুরু করলাম বাঁশির সুর তোলা ।বাঁশির সুমধুর সুর এ আস্তে আস্তে আমি নিজেই মোহিত হয়ে যাচ্ছি । আজ কেন জানি বাঁশির সুরটা একটু বেশি সুরেলা মনে হলো । সুরটা আনকোরা একেবারে নতুন । আমি বাঁশি বাজাচ্ছি তো বাজাচ্ছি । বাঁশির সুর এ আমি একেবারে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছি । হঠাৎ আমার মনে হলো বাঁশি বাজাতে বাজাতে আমার বাশির সুর আরো মধুর হয়ে যাচ্ছে ।বাঁশির সুর এত সুন্দর হতে পারে তা এতদিন বাশি বাজিয়েছি কখনো খেয়াল করিনি ।কেমন যেন বাশির সুরের সাথে ঝুম ঝুম করে হাল্কা নুপুরের একটা আওয়াজ হচ্ছে ।আওয়াজ টা এমন যে কাঁচ এর সাথে কাঁচ এর হাল্কা ঘর্ষনে টুংটাং টুংটাং যে আওয়াজ হয় তেমন । আর এদিকে আমার বাঁশির সুর এখন এমন একটা স্তরে পৌছে গেছে বলে মনে হচ্ছে যে নদীর পানিতে প্রতিধ্বনি তৈরি করে অপার্থিব সুরের এক মুর্ছনা গড়ে তুলেছে । আমার এতক্ষন কিছু হয়নি ।

(৮৮)

পরবর্তী পৃষ্ঠা দেখুন

error: Content is protected !!